পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম নৃপতিই আত্মজীবনী রচনা করেছেন। অতিশয়োক্তি ও রাজকীয় গৌরবগাথায় পরিপূর্ণ সেইসব আত্মকথার অধিকাংশেরই সাহিত্য ও ইতিহাসমূল্য নগণ্য যেহেতু সেগুলি ততটা স্বীকারোক্তিমূলক নয়, প্রামাণ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে হলে যতটা অকপট হওয়া কাঙ্ক্ষিত।
এদিক থেকে দেখলে, মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহিরউদ্দিন মুহম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০) বিরচিত বাবরনামা (আক্ষরিক অর্থ ‘বাবরের লেখা’ বা ‘বাবরের বই’) এক যুগান্তকারী গ্রন্থ। বাবরনামা কেবলই একের পর এক যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার কাহিনি শোনায় না, বরং ষোড়শ শতকের দ্বিতীয় দশকে মধ্য এশিয়ার ফরঘনা থেকে বিতাড়িত এক শাসক কী চোখে দেখছেন ভারতীয় উপমহাদেশকে, কীভাবে পরিচিত হচ্ছেন এক নতুন সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে, তাও জানায় সবিস্তারে।
তৎকালীন শাসকশ্রেণির সাহিত্যিক ভাষা ফারসির পরিবর্তে বাবর তাঁর মাতৃভাষা (উইগুর ও উজবেক ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি) চাঘতাই তুর্কিতে লেখেন এই আত্মজীবনীটি। পরবর্তীকালে, তাঁর পৌত্র সম্রাট আকবর গ্রন্থটিকে ফারসি ভাষায় (অনুবাদক আব্দুল রহিম) অনুবাদ করান। ফারসি থেকেই কালক্রমে তা বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনূদিত হতে থাকে। বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাবর-কৃত মূল চাঘতাই তুর্কি থেকে যে নির্ভরযোগ্য ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়, তা-ই বাবরনামা-কে আধুনিক ইতিহাস গবেষণার মূল স্রোতে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
বাবরনামা-র উৎকর্ষ বাবরের অকপটতায়। নিজের ব্যর্থতা, ভুল সিদ্ধান্ত, চারিত্রিক দুর্বলতা- কিছুই তিনি গোপন করেননি। সেইসঙ্গে রয়েছে যে মানুষদের সংস্পর্শে তিনি এসেছেন, তাঁদের নিখুঁত চরিত্র বিশ্লেষণ। শাসনব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তাঁর ভনিতাহীন মন্তব্য সবসময়ই বাস্তবানুগ। ভৌগোলিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম বর্ণনা প্রদানে ও তিনি অনবদ্য।
তৈমুরের বংশধরদের মধ্যে বাবর ছিলেন একজন প্রকৃত শিক্ষিত, অভিজাত শাসক। তাঁর সেই মার্জিত মননের প্রতিফলন আমরা বারবার খুঁজে পাই বাবরনামা-য়। ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি লেন-পুল, যিনি বাবরকে ‘প্রাচোর জুলিয়াস সিজার’ বলে অভিহিত করেছিলেন, যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘বাবরনামা হল এক সুশিক্ষিত, সংস্কারমুক্ত, সংবেদনশীল মানসিকতার মানুষের প্রত্যক্ষ বিবরণ, যার ঐতিহাসিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।’

Reviews
There are no reviews yet.