নগর কলকাতা শুধুই বর্তমান ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী কিংবা অতীতে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী হিসেবে বিশ্ববরেণ্য একটি শহরমাত্র নয়, কলকাতা মানে স্মৃতির পরতে জমে থাকা স্মৃতি, প্রজন্মের পর প্রজন্ম- জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস। এই শহরের অলিতে-গলিতে যেমন ইতিহাস হেঁটে বেড়ায়, তেমনই নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায় তার অশরীরী বাসিন্দারাও। বারিদবরণ ঘোষের আদি কলকাতার ভূতুড়ে বাড়ি সেই অদেখা, অজানা কলকাতারই এক বন্ধ দরজা খুলে দিল।
এটি কি ভূত নিয়ে নানান গল্পের বই? না কি ইতিহাস ছুঁয়ে-ছুঁয়ে অনুধাবন করতে চাওয়া মহানগরের অপার্থিব অশরীরী জগৎ? এ বই আসলে কলকাতা মহানগরীর ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, ইতিহাস, সাহিত্যিক স্মৃতি ও লোকবিশ্বাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধন।
বইয়ের প্রথমেই লেখক আমাদের নিয়ে যান কলকাতার বিতর্কিত বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ভবনের ভেতরে- হেস্টিংস হাউস, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, হাইকোর্ট, রাইটার্স বিল্ডিং, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি, মাঝেরহাট ব্রিজ। বিশেষ স্মর্তব্য যে, ভূতেরা এখানে ভয় দেখাতে আসে না; তারা আসে অতৃপ্ত ইতিহাস কিংবা অপূর্ণ ইচ্ছা হয়ে, অপরাধবোধ ও স্মৃতির প্রলম্বিত ছায়া হয়ে।
দ্বিতীয় অংশে, লেখক নিজেই হয়ে ওঠেন ভৌতিক ও অলৌকিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এখানে লেখকের ভাষা সকৌতুক, ভাষা পরিহাসমিশ্রিত, দৃষ্টিভঙ্গি যেন কোনও অজ্ঞেয়বাদীর। নিজের চোখে দেখা বিভিন্ন ভূতের (যেমন কুকুর ভূত, পেত্নী, মুসলমানি ভূত কিংবা দিনের আলোয় দেখা ভূতের অভিজ্ঞতা) কথা যেমন আছে, তেমনই আছে সংশয়।
এরপরেই বইটির অন্যতম চমকপ্রদ অংশ- আধুনিক শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভূত দর্শন! শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, সুচিত্রা মিত্র থেকে শুরু করে তপন সিংহ, মৃণাল সেন- স্বনামধন্যদের অলৌকিক অভিজ্ঞতা আমাদের জানায় যে, ভূত কেবল অশিক্ষিত মস্তিষ্কের অজ্ঞতাপ্রসূত উর্বর কল্পনা নয়; সৃজনশীল মানসেও দিব্যি হতে পারে ভূতের চাষবাস!
বইটির শেষ ভাগে পৌঁছে আমরা পাব বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কলকাত্তাইয়া ভূতেদের গল্প- পরশুরাম থেকে সত্যজিৎ রায় পর্যন্ত। এখানে লেখক নিজে গল্প বলেন না, বরং পাঠককে বুঝিয়ে দেন-কলকাতার ভূত বঙ্গসাহিত্যেরই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
যাঁরা কলকাতাকে ভালোবাসেন, যাঁরা মহানগরীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আগ্রহী এবং যাঁরা ভূতের গল্প পড়ে ভয় পেতে ভালোবাসেন, আদি কলকাতার ভূতুড়ে বাড়ি তাঁদের জন্য এক আকর্ষক পাঠ।

Reviews
There are no reviews yet.