পূর্বপুরুষ বাবরের আত্মজীবনী বাবরনামা-র মতোই সম্রাট জাহাঙ্গীরের আত্মজীবনী তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরি মধ্যযুগীয় ভারতের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী দলিল। আত্মজীবনী রচনার রীতির দিক থেকেও জাহাঙ্গীর কিয়দংশে বাবরের অনুসারী। অর্থাৎ, নিজের অনেক সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা এখানে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন। ফারসি ভাষায় রচিত এই সুখপাঠ্য রাজকীয় স্মৃতিকথার আড়ালে ধরা পড়েছে আত্মসমালোচনামুখর এক মানবচিত্র- যা তাঁর আত্মজীবনীকে প্রদান করেছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা।
বিশ শতকের প্রথম ভাগে, কুমুদিনী মিত্রর অনুবাদের মাধ্যমেই বাঙালি পাঠক প্রথমবার সরাসরি পরিচিত হন জাহাঙ্গীরের নিজের ভাষ্যে রচিত তাঁর জীবন ও সময়ের সঙ্গে। গ্রন্থটিতে জাহাঙ্গীরের রাজ্যাভিষেক, দস্তুর-উল্-আমল নামে দ্বাদশ ঘোষণাপত্র, জন্মকথা, প্রজানুরাগ, প্রশাসনিক সংস্কার, বিদ্রোহ দমন, ধর্মনীতি, পরিবার ও উত্তরাধিকার- প্রভৃতি বিষয় পৃথক পৃথক পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত হয়েছে।
জাহাঙ্গীরের শাসনদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর ন্যায়বিচার। আগ্রা দুর্গ থেকে যমুনা তীর পর্যন্ত স্থাপিত স্বর্ণশৃঙ্খল ও ঘণ্টার মাধ্যমে সাধারণ প্রজার সরাসরি সম্রাটের কাছে নালিশ জানানোর ব্যবস্থা তাঁর প্রশাসনিক চিন্তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে করমুক্তি, দুর্নীতিদমন, হাসপাতাল স্থাপন, পথিকশালা নির্মাণ, পশুহত্যা নিবারণের মতো সিদ্ধান্ত তাঁর শাসনের মানবহিতৈষী অভিমুখটিকে সুস্পষ্ট করে।
তবে এ কথা অনস্বীকার্য, এই আত্মজীবনী, বাবরনামা-র মতো সম্পূর্ণ স্বীকারোক্তিমূলক নয়। প্রশাসনে পত্নী নূরজাহানের অত্যধিক প্রভাব, ক্ষেত্রবিশেষে কঠোর দমননীতি কিংবা শিখগুরু অর্জুনকে মৃত্যুদণ্ডদানের মতো বিতর্কিত বিষয় এখানে সচেতনভাবে এড়িয়ে। এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবু, সংগীত, উদ্ভিদবিদ্যা, চিত্রকলা ও প্রকৃতিপ্রেমে অনুরাগী এক ন্যায়পরায়ণ সম্রাটকে নিবিড়ভাবে জানতে এই আত্মজীবনী পাঠ অপরিহার্য।
SAHITYA CHAYAN REFERENCE-5 / সাহিত্য চয়ন রেফারেন্স- পঞ্চম ভাগ 
Reviews
There are no reviews yet.