রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব।’ এই অক্ষয় মনুষ্যত্বের ধারক সেই ঋজু ইতিহাসপুরুষকে আজকের পাঠকের কাছে তথ্যনিষ্ঠ ও স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরার প্রয়াস থেকেই ঋষি দাস প্রণীত বিদ্যাসাগর গ্রন্থের প্রকাশ। বিদ্যাসাগরকে নিয়ে যে অকারণ আবেগমথিত প্রশস্তি কিংবা রূপকথা লেখার দস্তুর রয়েছে, ঋষি দাস তার উলটো পথে হেঁটে এই মহাজীবনকে তাঁর যুগ, সীমাবদ্ধতা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে স্থাপন করেছেন।
১২টি পরিচ্ছেদে সুবিন্যস্ত গ্রন্থটি বিদ্যাসাগরের জীবন ও সময়ের এক উপভোগ্য ধারাবিবরণী। ‘শুভ আবির্ভাব’ ও ‘শৈশব ও শিক্ষারম্ভ’ পরিচ্ছেদে বীরসিংহ গ্রামের দারিদ্র্য, পারিবারিক সংগ্রাম ও কঠোর শৈশবের ভিতর দিয়ে এক তেজস্বী চরিত্রের নির্মাণ পরিলক্ষিত হয়েছে। ‘সংস্কৃত কলেজ ও ছাত্রজীবন’ এবং ‘শিক্ষানায়ক-সরকারী-চাকুরে, লেখক, মুদ্রক ও প্রকাশক’ পরিচ্ছেদে বিদ্যাসাগরের অধ্যবসায়, পাণ্ডিত্য ও প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয় মেলে। ‘নারীর বন্ধু’ পরিচ্ছেদে আলোচিত হয়েছে বিধবাবিবাহ, নারীশিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের প্রসঙ্গ। এক্ষেত্রে তাঁর যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, তা আবেগ দিয়ে নয়, আলোচিত হয়েছে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে। ‘দীনের বন্ধু: মানুষের বন্ধু’ অধ্যায়ে করুণাসাগর বিদ্যাসাগরের মানবিক দিক যেমন উন্মোচিত হয়েছে, তেমনই ‘ঈশ্বর ও ঈশ্বরচন্দ্র’ পরিচ্ছেদে তাঁর যুক্তিবাদী মানসলোক আলোকিত হয়েছে। ‘পরিবারের কর্তা’ ও ‘লেখক ব্যবসায়ী’ অধ্যায়দ্বয় বিদ্যাসাগরকে কেবল মহাপুরুষ নয়, তার পাশাপাশি একজন বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন উদ্যোগী হিসেবেও পাঠকের সামনে হাজির করে। শেষের দিকে ‘মৃত্যুসরণী’ ও ‘পরিশেষ’ বিদ্যাসাগরের জীবনের অন্তিম পর্বকে সংযত আবেগে উপস্থাপন করেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য- পরিশেষের ঘটনাপঞ্জি, যেখানে বিদ্যাসাগরের জীবনের প্রধান ঘটনাগুলি কালানুক্রমে সাজানো হয়েছে। পাঠকের কাছে এটি একটি নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক সহায়িকা।
সব মিলিয়ে, ঋষি দাস প্রণীত বিদ্যাসাগর বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের এক ব্যতিক্রমী প্রয়াস। শুধু স্বল্প পরিসরে ঈশ্বরচন্দ্র নামক মহাজীবনের নির্যাস পাওয়ার জন্যই নয়, একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকে নতুন করে বিদ্যাসাগরকে অবলোকন ও অনুধাবন করার জন্যও বইটি অপরিহার্য।
পৃথিবীর শেষ স্টেশন || PRITHIBIR SESH STATION - FARUK AKHTAR
কবির নীরা || KABIR NIRA 
Reviews
There are no reviews yet.