শুধুই শ্রুতকীর্তি অধ্যাপক কিংবা কিংবদন্তি প্রাবন্ধিক-সম্পাদক-সাহিত্য সমালোচক হিসেবেই নয়, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ-এর ভূতপূর্ব এই সভাপতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছাত্রদলকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন তাঁর আচার্যসুলভ জীবন এবং সত্যানুরাগী সহজ জীবনদর্শনের মাধ্যমে।
গাঁইয়ার আপনকথা বারিদবরণ ঘোষের আত্মজীবনী অবশ্যই; কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এটি গড়পড়তা যে-কোনো আত্মকথার থেকে অনেক বেশি কিছু। ব্যক্তিগত স্মৃতির উর্ধ্বে উঠে এই বইটি বিংশ শতাব্দীর প্রথম অর্ধে ক্রমশ বদলে যেতে থাকা গ্রামবাংলার সামাজিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক ব্যতিক্রমী দলিল। বইটি পড়তে পড়তে মনে হবে- নিজের জীবন অছিলামাত্র, সে জীবনকে অবলম্বন করে লেখক আসলে তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁর যাপিত সময় ও দৃষ্ট সমাজকে। সেই সময়ের গ্রামীণ জীবন, সংস্কার, কুসংস্কার, পারিবারিক বন্ধন- ছবির মতো ভেসে ওঠে পাঠকের চোখের সামনে। লেখকের অনবদ্য বর্ণনাশৈলী সবকিছুকেই এমন এক পরিহাসাশ্রিত শ্লেষের ঢঙে পরিবেশন করে যে, প্রতিটি পৃষ্ঠাই হয়ে ওঠে পাঠযোগ্য।
বইটির বড়ো অংশ জুড়ে আছে লেখকের শৈশব ও ছাত্রজীবনের কথা। প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনা, একসঙ্গে বহু শ্রেণির পাঠদান, চাটাই পেতে বসে লেখা, স্লেট- পেনসিল ও ঘরে তৈরি কালি প্রভৃতির বিবরণ বয়স্ক পাঠককে যেমন স্মৃতিমেদুর করে তোলে, তেমনই গবেষকের কাছে তা হয়ে ওঠে সেই সময়ের বাংলার গ্রামীণ শিক্ষাব্যবস্থার নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য ও নথি। শিক্ষকরা তখন শুধু পাঠদাতা নন, তাঁরা ছিলেন চরিত্রনির্মাতাও। মাস্টারমশায়দের শাসন, স্নেহ এব্যাক্তিত্ব লেখকের মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল।
লেখকের কৌতূহলী স্বভাব ও বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ তাঁকে জাদু, বিজ্ঞান, হাতের কাজ, বই বাঁধাই-পরিভ্রমণ করিয়েছে নানা বিচিত্র জগতে। এসেছে জাদু সম্রাট পি সি সরকারের প্রসঙ্গও। তাঁর দলের সামান্য কর্মী হিসেবে লেখকের অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার কথা এ বই থেকে পাঠকের অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। নিজের মায়ের সংগ্রাম, সাহস ও নিঃশব্দ দায়িত্ববোধ লেখক তুলে ধরেছেন সংযত ভাষায়।
সব মিলিয়ে, গাঁইয়ার আপনকথা বিশ শতকের প্রথমার্ধে গ্রামবাংলার এক বহুস্বরিক ভাষা- ব্যক্তিবিশেষের জীবনকথা হয়েও যা সমকালীন মানুষ ও সমাজের কথা বলে অকপটে।
JYOTIRINDRANATH KADAMBARI O RABINDRANATH || 
Reviews
There are no reviews yet.