১৫৪২ সালের ১৫ অক্টোবর সিন্ধুর উমরকোট দুর্গে জন্ম নেওয়া শিশুটিই যে একদা মহামতি আকবর নামে বদলে দেবেন ভারত ইতিহাসের গতিপথ, সে কথা কে ভাবতে পেরেছিল?
দুর্ভাগ্যপীড়িত পিতা হুমায়ুনের অস্থির জীবনের উত্তরাধিকার হিসেবে এক ভগ্নপ্রায় মুঘল রাষ্ট্রের দায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর কাঁধে। নায়কোচিত পরাক্রম, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শী শাসকসুলভ বিচক্ষণতায় তাকেই তিনি কালক্রমে রূপান্তরিত করেন এক সুসংহত, স্থায়ী তথা সহিষ্ণু মুঘল সাম্রাজ্যে। ১৫৫৬ সালে মাত্র তেরো বছর বয়সে আকবর সিংহাসনে আরোহণ করেন। সেই বছরই পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে বিজয়লাভের মাধ্যমে তাঁর সামরিক তথা রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। এরপর বহু যুদ্ধে তিনি অবতীর্ণ ও বিজয়ী হলেও শত্রুদমনকেই তিনি রাষ্ট্রশাসনের একমাত্র নীতিতে পরিণত করেননি।
মনসবদারি প্রথার প্রবর্তন, টোডরমল প্রণীত রাজস্ব সংস্কার, প্রাদেশিক প্রশাসনের পুনর্গঠন প্রভৃতি সংস্কারের মাধ্যমে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা। সংখ্যাগুরু হিন্দু প্রজাদের আস্থা অর্জন করেন জিজিয়া কর প্রত্যাহার, রাজপুতদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদে হিন্দু অভিজাতদের অন্তর্ভুক্ত করে। ফতেহপুর সিক্রিতে প্রতিষ্ঠিত ইবাদতখানায় হিন্দু, মুসলমান, জৈন, খ্রিস্টান ও জরথুস্ত্র ধর্মগুরুদের সঙ্গে তাঁর প্রতর্ক শুধু ধর্মীয় কৌতূহল নিরসনে নয়, প্রযুক্ত হয়েছিল এক মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার অনুসন্ধানে। এ থেকেই জন্ম নেয় আকবর প্রবর্তিত দীন-ই-ইলাহি যা নৈতিক ও মানবিক বিবিধ আদর্শের সমাহারে সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক মার্গ উন্মোচিত করেছিল।
নিজে নিরক্ষর হলেও আকবর ছিলেন জ্ঞান ও বিদ্যাচর্চায় সবিশেষ উৎসাহী। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় মহাভারত, রামায়ণ-সহ বহু সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসি ভাষায় অনূদিত হয়। শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও তাঁর শাসনামল নবযুগের প্রবর্তন করেছিল। বীরবল, টোডরমল, তানসেন, আবুল ফজল-সমকালীন ভারতের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরদের সমন্বয়ে তাঁর নবরত্নসভা আজও আমাদের বিস্ময়ের উদ্রেক করে।
১৬০৫ সালে আকবরের জীবনাবসান হলেও তিনি রেখে যান এমন এক ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রভাবনা, যা ক্ষমতা, সহনশীলতা, প্রগতি ও সামাজিক ন্যায়কে অভিন্ন সূত্রে গ্রথিত করতে পেরেছিল। এই জীবনীগ্রন্থ সেই অসামান্য শাসকের জীবন, সময় ও দর্শনের নিবিড় পাঠ।
মুহূর্তকথা – হর্ষ দত্ত (প্রথম খণ্ড) / MUHURTA KOTHA - HARSH DUTTA (VOL-1) 
Reviews
There are no reviews yet.