ঔপন্যাসিক স্বয়ং যখন চয়ন করে নেন তাঁর উপন্যাসমালার এক-একটি আখ্যান, তখন নিশ্চিতভাবেই সেই নির্বাচনের পিছনে কোনো–না-কোনো অভিপ্রায় কাজ করে। ‘শ্রীবুদ্ধদেব গুহর স্বনির্বাচিত উপন্যাস’ (প্রথম খণ্ড) আমাদের বিস্ময় উদ্রেক করেছিল। সাতটি উপন্যাস নিয়ে শুরু হয়েছিল যে-সিরিজ, তাঁর দ্বিতীয় খণ্ডে এসে রচিত হয় এমন এক জীবন যে- জীবনকে ঘিরে এমন এক বহুমাত্রিক আখ্যান, যার সহস্র দ্বার অবারিত। উপন্যাসের এই সহস্র দুয়ার দিয়ে পাঠক পরিভ্রমণ করেন কথাসাহিত্যের ভুবনে।
সাতটি উপন্যাস নিয়ে ‘শ্রীবুদ্ধদেব গুহর স্বনির্বাচিত উপন্যাস’ (প্রথম খণ্ড) উপন্যাসের পটভূমি জামশেদপুরের রুক্ষ, শুষ্ক শিল্পাঞ্চল। একটি বাঙালি মেয়ের জবানিতে লেখা সেই উপন্যাস। ভুল বিয়ে করে ফেলে অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকা এক নারী। নাটকীয়ভাবে একের-পর-এক আরও ভুল সম্পর্কে জড়িয়ে যেতে থাকে সে। মেয়েটির অকপট আত্মকথন উন্মোচিত করে আমাদের মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের যাবতীয় ভণ্ডামি। আর ঠিক সেটিই অভিপ্রায় ঔপন্যাসিকের। এই সংগ্রহের সবকটি উপন্যাসই আসলে এক দর্পণ, যার প্রতিচ্ছবিতে পাঠক দেখে ফ্যালেন তাঁর নিজেরই মুখ।
সেদিন ‘বন্দে মাতরম্’ সম্পর্কে পুলিশ রিপোর্টে কী লেখা হয়েছিল? কী লেখা হয়েছিল অন্যান্য স্বদেশি গানগুলি সম্পর্কে? কেই-বা হয়েছিল গ্রেফতার? কে গাইল ফাঁসির মঞ্চে ‘বন্দে মাতরম’? বঙ্কিমবাবুর নিজস্ব কথা কী ছিল? কী বলেছিলেন ‘বন্দে মাতরম্’ সম্পর্কে তাঁর আত্মজার কাছে? বিংশ শতাব্দীর মধ্যযুগের চিন্তকরা কী লিখেছিলেন ‘বন্দে মাতরম্’-এর শতবর্ষে? পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জাতীয় সংগীতের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম্’ কি একই গোত্রের?
এরকম অসংখ্য জিজ্ঞাসার সন্ধান পাওয়া যাবে বইটির পাতায় পাতায়।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
‘নারীর দুঃখ’ হোক কিংবা ‘তেহেরানের স্বপ্ন’, প্রেম সুনীলের প্রতিটি গল্পে আলাদা এক চিত্রকল্প তৈরি করে। কখনো সেখানে আহত বাঘের মতো নায়ক চেটে নেয় নিজের ক্ষতস্থান, কখনও বা নায়িকাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে অনির্বচনীয় এক ভয়। দৃঢ় স্বাস্থ্যময়, গৌরবর্ণ উজ্জ্বল মুখ বৈমানিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে একটি গল্পে আরও মহীয়ান হয়ে উঠতে বলে মনীষার এক প্রেমিক, আরেক গল্পে প্রথমে যেমন জাহাজের মাস্তুলটুকু শুধু দেখতে পাওয়া যায়, তেমনি দূরে অবিনাশ দেখতে পায় রানির সুডৌল হাতটিকে। ‘মঞ্জরী’ গল্পে মঞ্জরীকে দেখে কথকের মনে হয় পৃথিবীতে কোনো ময়লা নেই, দুর্গন্ধ নেই, ঘাম নেই। কোথাও মানুষকে মানুষ মারছে না। মোলায়েম স্নিগ্ধ হাওয়ায় পৃথিবীটা ভরে গেছে। রাস্তা হয়ে যায় নদী, দুজনে দুদিকে, পার হবার উপায় নেই। ট্যাক্সির ব্রেক কষার দারুণ শব্দে রুক্ষ বাস্তবে ফিরে আসে কাহিনি। এইভাবেই বাস্তব আর কল্প-বাস্তব, স্বপ্ন আর দূরত্ব, প্রতীক্ষা আর ব্যর্থতা তৈরি করে প্রেমের অনিঃশেষ এক আখ্যান। স্বভাবতই, ‘রোম্যান্টিক’ বা অন্য কোনো সীমায়িত অভিধা তিরিশটি গল্পে ব্যাপ্ত বিচিত্র এই অনুভবরাশির নির্যাসকে আঘ্রাণ করতে অক্ষম।
বুদ্ধদেব গুহ
শুধু উপন্যাস নয়, ছোটোগল্পেও বুদ্ধদেব গুহ যে এক ব্যতিক্রমী কথাশিল্পী, তা আরও একবার প্রমাণিত এই সংগ্রহের অর্ধশত গল্পে। কোথাও চোরাশিকারি, কোথাও নবীন মুহুরি, কোথাও আবার সাকচুং সিং-এর মতো বিচিত্র চরিত্র ভিড় করে এ-সংগ্রহের পাতায়। ফলত সৃজিত হয় এক বৃহৎ ক্যানভাস, জীবনের জ্যামিতি যেখানে বদলে যায় অবিরাম।